চট্টগ্রামে শামীমের এক ডজন প্রকল্পের কী হবে

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

বৃহত্তর চট্টগ্রামে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। চট্টগ্রামের চার যুবলীগ নেতাকে দিয়ে জি কে শামীমের 'বাগিয়ে নেওয়া' হাজার কোটি টাকার অন্তত এক ডজন প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প চলমান থাকা অবস্থায় ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির ঘটনায় তিনি গ্রেফতার হওয়ায় প্রকল্পগুলোর কাজও অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে।

চট্টগ্রামে জি কে শামীমকে প্রকল্প বাগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেন এখানকারই কয়েকজন প্রভাবশালী যুবলীগ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। প্রকল্পগুলোতে তাদের কারও কারও অংশীদারিত্বও রয়েছে। জি কে শামীমের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবিপিএলের সহযোগী হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রামে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের ভাই ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন মন্টুর 'দেশ উন্নয়ন', চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাজাহান চৌধুরীর 'ফ্রেন্ডস ইন্টারন্যাশনাল', মহানগর যুবলীগ নেতা দিদারুল আলমের 'রয়েল অ্যাসোসিয়েটস' এবং যুবলীগ নেতা মুমিনুল হকের 'ডেলটা ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড কনসোর্টিয়াম'। জি কে শামীমের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরম সম্পর্কও ছিল। অর্থের বিনিময়ে প্রকল্প বাগিয়ে নিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করছিলেন তারা। এ কারণে চলমান প্রকল্পগুলোর মান যাচাই করা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারটি প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের আওতায় বৃহত্তর চট্টগ্রামে ৬টি প্রকল্পের কাজ করছে জি কে বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড (জিকেবিপিএল)। এরমধ্যে গণপূর্ত চট্টগ্রাম-১ বিভাগের আওতায় বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে ৪৮২ কোটি টাকায় জরাজীর্ণ ১১টি ভবন ভেঙে ৯টি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে ৯টি ভবনে ৬৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ চলছে। এছাড়া ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ফ্ল্যাট ও ডরমিটরি নির্মাণ করা হচ্ছে। 'চট্টগ্রাম শহরে পরিত্যক্ত বাড়িসমূহে সরকারি আবাসিক ফ্ল্যাট ও ডরমিটরি ভবন নির্মাণ' প্রকল্পের আওতায় এসব ফ্ল্যাট ও ডরমিটরি নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১১৪ নম্বর ও ৫২ নম্বর বাড়িতে ৫২ কোটি ৭২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৯ টাকার প্যাকেজের কাজ শুরু হয়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে প্রকল্পের কাজ চলছে। এই দুটি ভবন নির্মাণ জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছেন সাংসদ নজরুল ইসলামের ভাই জসিম উদ্দিন মন্টুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়নও। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও চবির দুটি ভবন

নির্মাণ করছে জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চবির নতুন কলা ভবন নির্মাণের ৭৫ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি করে কাজ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া পর্যটন নগরী কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবানেও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন জি কে শামীম। বান্দরবানের চিম্বুক এলাকার ছাইঙ্গ্যাপাড়ায় চলছে 'সিলভান ওয়াই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা' নির্মাণকাজ। প্রায় ৫০ একর জায়গাজুড়ে রিসোর্টটি নির্মাণে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে কাজ পেতে এখানকার কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারের সহযোগিতা পেয়েছেন জি কে শামীম। অবসরে যাওয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলীদের কোটি কোটি টাকা উৎকোচ দিয়ে চট্টগ্রামের কাজও বাগিয়ে নেন তিনি। জি কে শামীম ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়ার পর নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন তার চট্টগ্রাম অংশের সহযোগীরা।

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে জি কে শামীমের সঙ্গে অংশীদার ভিত্তিতে ঠিকাদারি কাজ করছে জসিম উদ্দিন মন্টুর দেশ উন্নয়ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও। জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন মন্টু সমকালকে বলেন, 'সাধারণত বড় কোনো প্রকল্প হলে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একা কাজ করে না। প্রকল্পে বিভিন্ন মানদণ্ড থাকে। জি কে শামীমের বড় ফার্ম রয়েছে। আমাদের প্রকল্পে মূলত তার প্রতিষ্ঠান থেকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট নেওয়া হচ্ছে।' এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, 'প্রভাব খাটিয়ে কিংবা অর্থের বিনিময়ে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি অবান্তর। কারণ, আমরা প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারে অংশ নিয়েছি এবং যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ পেয়েছি। ফলে আমাদের প্রকল্প নিয়ে ঝামেলা হওয়ার কথা নয়। অনেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মনগড়া অভিযোগ করছেন, যা সত্য নয়।'

জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ পেয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম। ইতিমধ্যে সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শামীমের প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকল্পের বিপরীতে অগ্রিম বিল নেওয়ার ঘটনা ঘটলে তার অন্য প্রকল্পের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।