এসব ভিসি লইয়া কী করিব?

বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

তারেক শামসুর রেহমান

শেষ পর্যন্ত গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। এই পদত্যাগ করা ছাড়া তার কাছে আর বিকল্প কিছু খোলা ছিল না। যখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় এবং ফিরে এসে তার অপসারণের সুপারিশ করে, তখন তার কাছে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। কিন্তু তার এই পদত্যাগ সেখানে বিরাজমান সব সমস্যার সমাধান করবে না। জাতির পিতার নামে ও তার জন্মস্থানে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিনি কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ভাবতেও অবাক লাগে। সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের তিনি জানোয়ার বলে গালি দিয়েছেন, তাদের বাবা-মা নিয়ে কথা বলেছেন। একজন ভিসি কি এসব বলতে পারেন? কাদেরকে আমরা ভিসি বানিয়েছি? ছাত্রছাত্রীরা সেখানে ১২ দিন পর্যন্ত আন্দোলন করল, তার বিরুদ্ধে ঝাড়ূ মিছিল হলো, এটা একদিকে সব শিক্ষকের জন্য যেমন অপমানের, তেমনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও খারাপ সংবাদ। শুরুতেই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি 'বিতর্কের' মধ্যে পড়ল। আমি মনে করি, তার পদত্যাগই যথেষ্ট নয়। তার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। সংবাদপত্রে যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে শিক্ষক হিসেবে আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়। একজন শিক্ষকই উপাচার্য হবেন; কিন্তু এ কেমন উপাচার্য আমরা পেলাম?

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ৩০ সেপ্টেম্বর এক সভায় সততা ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করার জন্য উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো উপাচার্য বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বলেননি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সততা ও নৈতিকতার কথা উপাচার্যরা কি আদৌ শুনবেন কিংবা শুনলে কতটুকু শুনবেন? প্রধানমন্ত্রী ক্যাসিনো সম্রাটদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়ে একটা মেসেজ দিয়েছেন। আর মেসেজটি হচ্ছে পরিস্কার- কোনো দুর্নীতি ও অন্যায় তিনি সহ্য করবেন না। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ সাধারণ মানুষ সমর্থন করেছে। এখন বোধকরি সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এক ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানোর। কেননা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। অতি ক্ষমতাবান ভিসিরা প্রায় ক্ষেত্রেই কোনো আইন-কানুন মানছেন না। শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, বরং একাধিক উপাচার্য নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হয়েছেন।

সর্বশেষ ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. জাকারিয়ার নিয়োগ বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। সেখানে উপ-উপাচার্যকে বলতে শোনা গেছে, 'তোমরা কয় টাকা দেওয়ার জন্য রেডি'- এই বক্তব্যটি। এর আগে দিনাজপুরে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের জনৈক সহকারী অধ্যাপক নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত। জাবি ভিসির 'ঈদ সালামি' তো বহুল আলোচিত (দুই কোটি টাকা)। যদিও তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। শিক্ষকরা তাকে কালো পতাকা দেখাচ্ছেন প্রতিদিন। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য দুই কোটি টাকার 'গোবর' কেলেঙ্কারিতেও অভিযুক্ত। এ সংক্রান্ত সংবাদ গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে। সেখানকার শিক্ষকরা যে ১৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, এর ৩নং দফায় ভিসির বাসায় বিউটি পার্লার তৈরির অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী কর্মচারী তার সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করে ভিসির বাসার সামনে অনশন পর্যন্ত করেছিলেন। অথচ উপাচার্য দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব পেয়েছিলেন। একসময় ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই ভিসি শুধু গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার কারণেই কি বারবার ভিসি হয়েছিলেন?



সম্প্রতি শাবিপ্রবির উপাচার্যের বিরুদ্ধে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ওই শ্বেতপত্রে তার বিরুদ্ধে ৫৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, টিএ-ডিএসহ প্রতি সপ্তাহে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় যাওয়া, নিজে একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, ব্যক্তিগত আক্রোশে কিছু শিক্ষকের 'আপগ্রেডেশন' স্থগিত করা ইত্যাদি। একটি জাতীয় দৈনিক উপাচার্যদের আমলনামা নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল কিছুদিন আগে। আর ১৪ জন বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে ইউজিসি। এর মাঝে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়; পাবনা, রোকেয়া ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী দেখে এদের মনোনয়ন দিয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়েছিল? এদের আয়-সম্পত্তির হিসাব কি এনবিআর খতিয়ে দেখবে? যুবলীগ নেতাদের যদি আমলনামা নেওয়া হয়, যদি তাদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়, তাহলে অভিযুক্ত ভিসিদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হবে না কেন?

ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সবাই আজ অভিযোগের কাঠগড়ায়। ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে মালয়েশিয়ায় 'দ্বিতীয় হোম' বানাবেন, ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে ঢাকায় বসে গার্মেন্ট ব্যবসা করবেন, এনজিও চালাবেন, সকালের ফ্লাইটে ক্যাম্পাসে গিয়ে বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসবেন- এগুলোও অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ ধরনের অন্যায় করবেন- এটা সত্যিই দুঃখজনক। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দিলে এরা এভাবেই পার পেয়ে যান। দুঃখ লাগে, যখন দেখি দু'একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমন একটা সোচ্চার নন। শিক্ষকরা পদোন্নতির নীতিমালা নিয়ে যতটুকু সোচ্চার হয়েছেন, উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা তেমন সোচ্চার হননি। শিক্ষকরা জাতীয় আদর্শ। তারা যদি তাদের সহকর্মীদের (উপাচার্যরা তো তাদের সহকর্মীই) বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হন, তাহলে আগামীতে তারা আর কোনো সম্মান নিয়ে সমাজে বাস করতে পারবেন না।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবলিক) সংখ্যা এখন ৪৫টি। শিক্ষামন্ত্রী তার নিজ জেলা চাঁদপুরেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিতও হয়েছে। আমার নিজের জেলা পিরোজপুরেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন জেলার মন্ত্রী। এসব বিশ্ববিদ্যালয় আদৌ শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারবে কি-না, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তবে ভয়টা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ তথা নির্মাণ কাজে যে দুর্নীতি হয়, তা আমরা বন্ধ করব কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন শতকোটি নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকার এ ক্ষেত্রে উদার। সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য হিসেবে আমি কিছু সুপারিশ রাখতে চাই, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করবে।

এক. রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় কর্মকাণ্ডে যিনি সম্পৃক্ত, তাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে নিরপেক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি উপাচার্য প্যানেল তৈরি করবে। সেখান থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। উপাচার্যরা হবেন শুধু এক টার্মের জন্য। নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের অলিখিত বিধান বদলাতে হবে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি করেই শিক্ষকরা উপাচার্য হন। ফলে শিক্ষক রাজনীতি করতে গিয়ে তারা একটা 'বলয়' তৈরি করেন। আর ওই বলয়ের কারণেই উপাচার্য বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে যান এবং ওই সুবিধাভোগীদের স্বার্থে কাজ করেন।

দুই. শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির মতো একটি কমিশন গঠন করতে হবে। তিন পর্বের নিয়োগ প্রক্রিয়া সমর্থনযোগ্য। নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আলাদা বোর্ড গঠন করতে হবে। ওই বোর্ডে একাধিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। এই কমিশন ইউজিসির বাইরে কাজ করবে অথবা ইউজিসির অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে।

তিন. বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডারে যেতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকা মানেই হচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপের পক্ষ হয়ে কাজ করা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা কিছু শিখতে পারি।

চার. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোনো কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং টিভিতে 'পূর্ণকালীন' কাজ করেন। পৃথিবীর কোথাও এমনটি চিন্তা করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা এ কাজটি করেন। জাবির উপাচার্য সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপ-উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন এবং বেশি সময় দেন। এটা তিনি পারেন না। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। এটার তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক ধরনের 'সংকটের' মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়ম ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে; তারা সরকারকে সুপারিশ করবে। ইউজিসির পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের 'নানা কাহিনী' আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করছে যে, এখনই সময়। এখনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
tsrahmanbd@yahoo.com