গোয়েন্দা নজরদারিতে পেঁয়াজ মজুদদাররা

বাজার স্বাভাবিক রাখতে 'নরম-গরম' কৌশল প্রশাসনের

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রাখতে 'নরম-গরম' কৌশলে এগোচ্ছে প্রশাসন। পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি করা ব্যবসায়ীদের রাখা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিতে। যারা অসৎ উদ্দেশ্যে পেঁয়াজ মজুদ করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর যারা সৎভাবে ব্যবসা করতে চান, তাদের পেঁয়াজ আমদানিতে উৎসাহিত করতে সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে মার্জিনের হারও রাখতে বলা হয়েছে নূ্যনতম পর্যায়ে। এদিকে, অসৎ ব্যবসায়ীদের কঠোর বার্তা দিতে চট্টগ্রামের আমদানিকারক ও আড়তদারদের নিয়ে এরই মধ্যে বৈঠক করেছে প্রশাসন। বৈঠক হয়েছে কক্সবাজারেও। গত এক মাসে বিদেশ থেকে কে, কী পরিমাণ পণ্য এনেছেন- সেই তথ্য চাওয়া হচ্ছে আমদানিকারকদের কাছ থেকে। আবার কখন কার কাছ থেকে কী দামে কত পণ্য ক্রয় করা হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হচ্ছে আড়তদারদের কাছ থেকে। তথ্য চাওয়া হচ্ছে টেকনাফ স্থলবন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও। প্রশাসনিক এই অ্যাকশনের পাশাপাশি গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের পাইকারি মোকাম চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ৪০টি গুদামে অভিযান চালিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব গুদামে পর্যাপ্ত পেঁয়াজের মজুদ আছে বলেও নিশ্চিত হয়েছে প্রশাসন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক নাসরিন পারভীন তিরবীজি বলেন, 'চট্টগ্রামে পেঁয়াজের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে এরই মধ্যে বৈঠক করেছি আমরা। সৎভাবে যারা ব্যবসা করেন, তাদের অভয় দিয়েছি। আর যারা কারসাজির চিন্তা করছেন, তাদের দিয়েছি কঠিন বার্তা। বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কেনাবেচার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যারা পণ্য গুদামজাত করেছে, তাদের ব্যাপারেও তথ্য নিচ্ছে গোয়েন্দারা। চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক গুদাম আছে। কোথায় কার গুদাম আছে, সবকিছুই জানা হয়েছে আমাদের।'

ব্যবসায়ীদের বার্তা দিতে টেকনাফ স্থলবন্দরেও বৈঠক করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, 'মিয়ানমার থেকে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে ১০-১২ ব্যবসায়ী পেঁয়াজ আমদানি করেন। গত এক মাসের আমদানি মূল্য পর্যালোচনা করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, মিয়ানমার থেকে আনা পেঁয়াজের দাম ৪২ থেকে ৪৩ টাকার মধ্যে। পরিবহনসহ সবকিছু হিসেবে আনলেও বাজারে এ পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে থাকার কথা। এর বাইরে যারা মুনাফা করেছেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ জন্য সক্রিয় আছে গোয়েন্দা সংস্থা।'

জানা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কক্সবাজারের ৩০-৪০ ডজন ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে আছে পেঁয়াজের বাজার। ভারত রফতানি বন্ধ করলেও সেখান থেকে আনা পেঁয়াজ এখনও আছে এসব ব্যবসায়ীর গুদামে। মিয়ানমার থেকে আমদানীকৃত পেঁয়াজেরও মজুদ আছে তাদের কাছে।

এদিকে সমকালের টেকনাফ প্রতিনিধি আবদুর রহমান জানান, মিয়ানমার থেকে এখন প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টনেরও বেশি পেঁয়াজ আসছে। গত চার দিনে প্রায় আড়াই হাজার টন পেঁয়াজ এসেছে দেশটি থেকে। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ এসেছে তিন হাজার ৫৭৩ টন। এ রুট দিয়ে আমদানি করা পেঁয়াজের ৮০ শতাংশই আছে ১০-১২ ব্যবসায়ীর কাছে। গতকাল এক দিনে সর্বোচ্চ ৮০৫ টন পেঁয়াজ এসেছে মিয়ানমার থেকে। এখন পর্যন্ত সেখান থেকে আসা পেঁয়াজের ৯০ শতাংশই আমদানি করেছেন এমএস ট্রেডিংয়ের মালিক মো. হাসেম, যদু চন্দ্র দাশ, নুরুল কায়েস সাদ্দাম, মোহাম্মদ জব্বার, জিন্নাহ অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক শওকত আলম, এশিয়া এন্টারপ্রাইজের সাইফুদ্দিন, মো. নাছির, মোহাম্মদ কামাল, মোহাম্মদ কাদের, কেএম ট্রেডিংয়ের মালিক আলম বাহাদুর, গ্লোবাল লজিস্টিক ইন্টারন্যাশনালের শওকত আলম, আরাফাত, মোহাম্মদ শুক্কুর, মোহাম্মদ কামরুল, আবু আহমদ ও মহসিন।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের ব্যবসা করা শীর্ষ আড়তদাররা হচ্ছে মেসার্স হাজি অছিউদ্দিন সওদাগর, মেসার্স আবদুল আউয়াল, মেসার্স শাহজালাল ট্রেডার্স, মেসার্স বাগদাদী করপোরেশন, এসএন ট্রেডার্স ও সোনালী ট্রেডার্স। এ ছাড়া ঢাকা ট্রেডার্স, হাফেজি করপোরেশন, জেনি এন্টারপ্রাইজ, এনএস ইন্টারন্যাশনাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবনগর এলাকার মেসার্স টাটা ট্রেডার্স, সাতক্ষীরার মেসার্স দীপা এন্টারপ্রাইজ ও রিপা ট্রেডার্স পেঁয়াজ বেচাকেনায় বড় ভূমিকা রাখছে বলে নিশ্চিত হয়েছে প্রশাসন।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের শীর্ষ পেঁয়াজ আমদানিকারক এমএইচ ট্রেডিংয়ের মালিক মো. হাসেম বলেন, 'আমরা পেঁয়াজ এনেছি বলে বাজার এখন স্বাভাবিক হচ্ছে। সরকার থেকে সাপোর্ট পেলে আমদানি আরও বাড়বে। আর বাধা পেলে আতঙ্কে আর কেউ পেঁয়াজ আমদানি করবে না।' টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে এককভাবে সর্বোচ্চ এক হাজার টনেরও বেশি পেঁয়াজ আমদানি করেছেন মো. হাসেম।

শীর্ষ আরেক পেঁয়াজ আমদানিকারক শওকত আলম বলেন, 'আমরা নূ্যনতম লাভে পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। কারসাজি হলে পাইকারি মোকামে হয়েছে।' তবে পাইকারি মোকাম চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'আমদানিকারকরা বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে শর্তারোপ করেছেন আমাদের। আমরা ৫০ পয়সা কমিশনে পেঁয়াজ বিক্রি করতে রাজি আছি। কিন্তু তারা বিক্রিমূল্য বেশি চাওয়ায় আমাদেরও বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়েছে। সরকার নজরদারি বাড়ানোর কারণে এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছেন তারা। যার কারণে বাজারও আগের চেয়ে অনেক স্বাভাবিক হয়েছে। আমদানি বাড়লে দাম আরও কমবে।'

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ৪০ গুদামে অভিযান :পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক করতে গতকাল ফের পাইকারি মোকাম চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জে অভিযান চালিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমদকে সঙ্গে রেখে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম এ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযান প্রসঙ্গে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, 'ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ পেঁয়াজের সংকটের কথা বলেছেন। কিন্তু গুদামে গিয়ে আমরা পর্যাপ্ত মজুদ দেখতে পেয়েছি। আড়তদারদের বলেছি, আমদানিকারকদের কাছ থেকে এসব পেঁয়াজ তারা কত টাকায় কিনছে, সেটির রসিদ যাতে সঙ্গে রাখেন। বাজারদর মোটামুটি স্বাভাবিক থাকায় জরিমানা না করে সতর্ক করে এসেছি সবাইকে।'

বিষয় : পেঁয়াজ